রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলতি সপ্তাহেই শুরু হতে পারে ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’, ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি :
পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। দেশের প্রথম পরমাণু নির্ভর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমোদন পেলে চলতি সপ্তাহেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এই প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। এরপরই শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, যা রিঅ্যাক্টরের মোট ক্ষমতার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ শুরু করা হবে।
প্রকল্পের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার ‘স্টেজ-সি’ পর্যায়
প্রকল্প কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বায়েরা সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রকল্পটি ‘স্টেজ-সি’ বা কমিশনিং পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে কেন্দ্রটির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—কেন্দ্রটির নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের চূড়ান্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসানের ভাষ্য, স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ এবং সুরক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থার মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা এবং জেনারেটরসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিগুলো স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
গ্রিড সংযোগ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসানের মতে, স্টেজ-সি পর্যায়ের অন্যতম প্রধান মাইলফলক হলো জেনারেটরকে সফলভাবে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা। এতে গ্রিডের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল সমন্বয়ের সক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হওয়া এবং বায়রার ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্সসহ সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কেন্দ্রটি পরবর্তী ‘পাইলট অপারেশন’ বা পরীক্ষামূলক পরিচালনা পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, স্টেজ-সি পর্যায়ে প্রবেশ, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা এবং চূড়ান্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া—এই তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা মাইলফলক। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত শতভাগ পূরণ করতে হবে।
সমন্বয় ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ
পাওয়ার স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং পরিশেষে জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার মতো স্পর্শকাতর কাজ পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের পাশাপাশি অফ-সাইট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কঠোর সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
এসব বাহ্যিক সংস্থার মধ্যে রয়েছে—বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সামরিক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তর।
বিশ্বমঞ্চে নতুন মাইলফলকের অপেক্ষা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ২০-২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এরপরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। উৎপাদনে যাওয়ার পর অন্তত ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলবে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে নতুন যুগের সূচনা করবে।
ব্যয় বেড়েছে ডলারের দর বৃদ্ধিতে
প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও তা দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও দর বৃদ্ধির সুযোগ নেই। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট নির্মাণব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।