পাবনা প্রতিনিধি
হৃদরোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কমানোসহ স্ট্রোক, পক্ষাঘাত ও দুর্ঘটনাজনিত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ফিজিওথেরাপি এক অপরিহার্য চিকিৎসা।
অথচ পাবনায় জেলা পর্যায়ের প্রধান সরকারি হাসপাতালেই গড়ে ওঠেনি কোনো পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি ইউনিট। ফলে এই চিকিৎসার জন্য রোগীদের ভরসা করতে হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর। কিন্তু যাতায়াতের দীর্ঘ পথ, দূর-দূরান্ত থেকে আসা-যাওয়ার ঝক্কি এবং বাড়তি চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ।
৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। দিবসটি পালনের প্রাক্কালে পাবনার সার্বিক ফিজিওথেরাপি সেবার এই নাজুক চিত্র ফুটে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগী সেবা নিতে এলেও থেরাপি সেবা একেবারেই সীমিত। হাসপাতালেই নেই কার্যকর কোনো ফিজিওথেরাপি সেন্টার। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) সবুজ হোসাইন ও নিলুফার ইয়াসমিন স্বেচ্ছাসেবক কর্মীদের সহায়তায় মাত্র কয়েকজন রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। ফ্রোজেন শোল্ডার, কোমর ও ঘাড় ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং মুখ বাঁকা হওয়া (বেলস পালসি) রোগীদের বাইরে নতুন কোনো সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ইনফ্রারেড রেডিয়েশন (IRR), আল্ট্রাসাউন্ড কিংবা আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপির (UST) মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি স্পিচ কিংবা অকুপেশনাল থেরাপির জন্য নেই কোনো আলাদা দক্ষ জনবল।
এদিকে, আধুনিক চিকিৎসার অভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন হৃদরোগীরা। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহরিয়ার কবির জানান, গুরুতর হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে বিশেষায়িত কার্ডিয়াক ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে কার্ডিয়াক আইসিইউসহ বিশেষায়িত ব্যবস্থা না থাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা এই সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারি হাসপাতালে সেবার পরিধি সীমিত হওয়ায় রোগীদের বাধ্য হয়ে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি থেরাপি সেন্টারগুলোতে। এই যেমন, পাবনার বেড়া উপজেলার বনগ্রামের গৃহবধূ সাদিয়া সেলিনা দোলার গল্পটি পাবনার প্রান্তিক রোগীদের বাস্তবতার এক স্পষ্ট উদাহরণ।
দোলা বলছিলেন, বছরখানেক আগে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি পাবনা শহরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত (সিআরপি)-তে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিয়ে তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। তবে এই সুস্থতার পেছনে তাঁকে সইতে হয়েছে সীমাহীন কষ্ট।
সাদিয়া সেলিনা দোলা জানান, থেরাপির জন্য প্রতিদিন তাকে বেড়া থেকে পাবনা শহরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ যাতায়াত করতে হয়েছে। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি প্রতিদিনের এই দীর্ঘ যাতায়াত ও থেরাপির ব্যয় বহন করতে গিয়ে তাঁর পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
আটঘরিয়ার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আব্দুল মান্নান জানান, তিন বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বাম হাত অকেজো হয়ে পড়ে। সরকারি হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি না পেয়ে চিকিৎসা নেন সিআরপিতে। এখন অনেকটা সুস্থ হলেও,বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশী টাকা তাকে গুণতে হয়েছে। এসব সামর্থ্য যাদের নেই,তারা থেরাপি নিতে না পেরে আরও অসুস্থই থেকে যান।
সরকারি হাসপাতালের বেসরকারি কেন্দ্র সিআরপি-তে নিউরোলজিক্যাল, মাসকিউলোস্কেলিটাল, অকুপেশনাল এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির সুব্যবস্থা রয়েছে।
সিআরপির পাবনা সেন্টার ম্যানেজার মো. শরিফুল ইসলাম খান জানান, তাঁদের কেন্দ্রে দৈনিক প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী থেরাপি সেবা নিচ্ছেন। শনিবার থেকে বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা এবং বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সেবা প্রদান করা হয়। এক ঘণ্টার থেরাপি সেশনের জন্য ৪০০ টাকা এবং আধা ঘণ্টার জন্য ৩০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। তবে দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের ক্ষেত্রে খরচে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, হৃদরোগ সংক্রান্ত জটিল থেরাপিগুলো আইসিইউ-কেন্দ্রিক হওয়ায় তা প্রদান সম্ভব না হলেও, প্রাথমিক ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শমূলক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষ করে দূর-দূরান্তের রোগীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় মূল ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দূর থেকে আসা দীর্ঘমেয়াদী রোগীদের শহরে অবস্থান বা প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পেছনে থেরাপি খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।
এদিকে,মফস্বল পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি সেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে সরকারি উদ্যোগে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রার্থীরা । ২৫০ শয্যার পাবনা জেনারেল হাসপাতালে অবিলম্বে পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি ইউনিট চালু এবং হৃদরোগীদের জন্য কার্ডিয়াক আইসিইউ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবী ভুক্তভোগীদের। একই সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দীর্ঘমেয়াদী রোগীদের খরচ ও যাতায়াতের কষ্ট কমাতে জেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে স্বল্প মূল্যের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।