’চার ভাইবোন আর বাপ-মা নিয়ে ছয়জনের সংসার। বাপে খাইতে দিতে পারে না, তাই ১৪ বছর বয়সেই আমারে বিয়া দিয়া দ্যায়। স্বামীও বেশি উপার্জন করে না। দুই বাচ্চা হওয়ার পর থেইক্যা শরীরে জ্বরজ্বর লাগে। কিছু খাইতে মন চায় না। টাকাও নাই যে, ডাক্তার দেখামু।’ কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের শেফালী বেগম। দুই সন্তানের মা শেফালীর বয়স ১৮। জেলিয়াপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে এসে এসব কথা বলেন জরায়ুর সংক্রমণে আক্রান্ত শেফালী।
সন্তান জন্ম দেওয়ার পর থেকেই শেফালী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। পরে জানতে পারেন, জরায়ুতে সংক্রমণ ঘটেছে। দেবহাটা ইউনিয়নে শেফালীর মতো অসংখ্য কিশোরী বাল্যবিয়ের শিকার। তাঁদের আরেকজন জাহানারা। এখনও কৈশোর অতিক্রম হয়নি। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় দুই সন্তানের মা তিনি। বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দেখেই বোঝা যায় অপুষ্টিতে ভুগছেন।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণবঙ্গের দেবহাটায় বেশিরভাগ পরিবার দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে শিশুরা। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এই এলাকা থেকে মানব পাচার হয় বেশি। এলাকার প্রায় ৬০ ভাগ কিশোর মাদকাসক্ত হওয়ায় অভিভাবকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। নানা দুর্যোগ তাঁদের পিছু ছাড়ে না, বছরজুড়েই অভাব লেগে থাকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে অভিভাবকরা ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সেই কন্যাশিশুকে বিয়ে দিচ্ছেন। সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানেন না অনেক অভিভাবকই।
জরায়ুতে টিউমার হয়েছে ১৭ বছর বয়সী স্বপ্না ঘোষের। তার মা রত্না ঘোষ সমকালকে বলেন, ‘আগে জানলে মাইয়াডারে বিয়া দিতাম না। দেবীর মতোন চেহারা মাইয়াডার দিকে এখন আর তাকান যায় না। ডাক্তার কইছে জরায়ু ফালাইয়া দিতে অইবো। জরায়ু ফালাইয়া দিলে তো জামাই মাইয়ডারে রাখব না।’
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল লতিফ সমকালকে বলেন, ‘অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের মতো এখানেও বাল্যবিয়ে বেশি হয়। কম বয়সে বিয়ে হওয়ায় অনেক মা অপুষ্টিতে ভোগেন। তাঁদের জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ তিনি জানান, অনেকে জরায়ুর সংক্রমণ নিয়ে আসেন। সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ২০২১ সালের আগস্ট থেকে গত জুলাই পর্যন্ত ৩৫৭ জনকে পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে দু’জনের ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে মা হওয়া এবং ঘন ঘন সন্তান ধারণ করা জরায়ুমুখ ক্যান্সার সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু দেবহাটা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হচ্ছে বাল্যবিয়ে। এ পরিস্থিতিতেই চলছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ মাস। চিকিৎসকরা বলছেন, কম বয়সে বিয়ে হওয়া নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি। জরায়ুর সংক্রমণ, জরায়ুতে টিউমার, রক্তস্বল্পতা, ফিস্টুলাসহ নানা সমস্যায় ভোগেন তাঁরা। তাঁদের সন্তানও কম ওজন, চোখের সমস্যা নিয়ে জন্মায়। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বাল্যবিয়ের পরিণতি হিসেবে নারীদের প্রতি সহিংসতা, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বাল্যবিয়ের কারণে নারী শিক্ষার হারও কমে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগেই। ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। এর কারণ অর্থনৈতিক সংকট ও কিশোরীর নিরাপত্তাহীনতা। বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ২০ শতাংশ সন্তানের মা হচ্ছেন। ২৪ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুই বা ততোধিক সন্তানের মা হচ্ছেন অনেকে। এসব কারণে প্রসূতির মৃত্যুর হার এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা বাড়ছে।
রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ডা. শেহরিন এফ সিদ্দিকা সমকালকে বলেন, ‘জরায়ুমুখ ক্যান্সার নারীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ। সময় এসেছে এমন মৃত্যু প্রতিরোধের। এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গণসচেতনতা সৃষ্টি ও স্ট্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা সবার কাছে নিয়ে যাওয়া। ৯ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা গেলে শত বছরের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হবে।’
দেশে ক্যান্সারে নারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যান্সার দ্বিতীয় প্রধান কারণ। প্রতি বছর দেশে ১১ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মারা যান এবং পাঁচ কোটিরও বেশি নারী এর ঝুঁকিতে আছে। ৯ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত সব সুস্থ নারীকে এর ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন। রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক পারভীন শাহীনা রহমান বলেন, আগে সার্জিক্যাল ট্রিটমেন্ট ছিল। এখন ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমো থেরাপি, রেডিও থেরাপিও যোগ হয়েছে। তবে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসায় পরীক্ষার হার বাড়ছে না। একদম শেষ পর্যায়ে রোগীরা আসছেন। এর প্রধান কারণ অসচেতনতা।