শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন
নোটিশ :
আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অভিনন্দন : আপনার এলাকার উন্নয়ন অনিয়ম, অপরাধ, শিক্ষা শিল্প- সংস্কৃতি , ইতিহাস- ঐহিত্য , অবহেলা-অবিচারসহ প্রয়োজনীয় সঠিক তথ্য টিত্র পাঠান। আমরা যাচাই-বাছাই করে তাহা গুরুত্বসহকারে প্রচার করব।  

দেশ প্রেমের অভাব; অন্যকিছুর নয়

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / ৪৩০ ২৩৫ বার পড়া হয়েছে :
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করলাম। ইতোমধ্যে আমাদের অগ্রগতির মাইলফলকে উন্নতির নানা চিহ্ন উৎকীর্ণ হয়েছে। চিহ্নগুলো অস্পষ্টও নয়। দালানকোঠা প্রচুর উঠেছে, প্রতিনিয়ত উঠছে। মোবাইল ফোনের ব্যবহার দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী। ভোগ-উপভোগের সীমা-পরিসীমা নেই। বিদেশ থেকে বাংলাদেশিদের পাঠানো টাকার পরিমাণ বেড়েছে। শুধু যে তৈরি পোশাক, তা নয়; ওষুধপত্রও আমরা রপ্তানি করছি। খাদ্য উৎপাদনও স্থবির হয়ে থাকেনি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সূচকও খারাপ নয়।
কিন্তু যে প্রশ্নটা বারবার আসে, আসা দরকার; এলে ভালো; সেটা হলো- এসব উন্নতিতে জীবনযাত্রার গুণগত মান কতটা বাড়ল। বলাই বাহুল্য, পরিমাণের বৃদ্ধি মানেই যে গুণের বৃদ্ধি- এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়েও উন্নতির উৎকর্ষ বোঝানো যাবে না। ধরা যাক কর্মসংস্থান বিষয়ে। সেটা যদি না বেড়ে থাকে তাহলে উন্নতির হাঁকডাক অর্থহীন শোনাবে; শোনাচ্ছেও। কর্মসংস্থানের একেবারে অপরিহার্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি যে সামান্যই ঘটেছে, সেটাও একটি ভ্রূকুটি বটে। জ্বালানি তেলের হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। হেন কোনো পণ্য নেই, যার দাম বাড়েনি। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কম হওয়া সত্ত্বেও খোঁড়া অজুহাতে সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করে বসেছে।
নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বলা চলে, মেয়েরা তো বটেই; ছেলেরাও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না। নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর সদস্যদের নিজের বাড়ির দরজায় দেখলে কোনো নাগরিকই বলতে পারবেন না- তিনি নিরাপদ বোধ করছেন। শিশু বেড়ে ওঠে অবহেলায়; প্রবীণদের অবজ্ঞা চলে নিরন্তর। এসবই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতা।
উন্নতির বিদ্যমান ধারাপ্রবাহটি যে মোটেই মানবিক নয়; তার নিশ্চিত প্রমাণ হলো এই উন্নতির প্রকোপে নদীর দুর্দশা। প্রায় সব নদীরই এপার-ওপার দখল হয়ে গেছে। কোনো কোনোটি শুকিয়ে গেছে, আর কিছু কিছু নদীর পানি অচিন্তনীয় রূপে দূষিত। যেমন ঢাকা শহরের চারটি নদী- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ তো উন্নতির বর্জ্য বহন করে মৃত্যুশয্যায় শায়িতই হয়নি; বলা হচ্ছে- তারা মারাই গেছে।
অন্য সবকিছুর মতো উন্নতিরও একটা দর্শন থাকে। বাংলাদেশে উন্নতির যে দর্শন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি হলো অন্যান্য বিবেচনাকে পদদলিত করে ব্যক্তিকে বড় করে তোলা। একজন বড় হবে নয়জনকে দাবিয়ে দিয়ে- নীতি এটাই। কিন্তু এর ফলে ওই একজনের উন্নতি যে মোটেই নিরাপদ হচ্ছে না; এমনকি সেটাও বিবেচনার মধ্যে আসছে না। উন্নয়নে-আহত ওই নয়জনের কারণে উন্নতিকে ঘরে-বাইরে পাহারাদারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বস্তি উচ্ছেদ করেও কূল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার নতুন বস্তি বসছে। পরিবেশ অদূষিত থাকছে না; প্রতিনিয়ত নোংরা হচ্ছে। উন্নতদের পক্ষে এসব সহ্য করা কঠিন হতো, যদি তাদের বিবেক না থাকুক, অন্তত কিছুটা চক্ষুলজ্জা থাকত।
সর্বত্র তৎপরতা চলছে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দেওয়ার। ব্যক্তিমালিকানায় সবকিছু ভালো চলে- এমনটা প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানা আসলে যে কী জিনিস, তা নিয়ে তো আমরা যখন অনুন্নত ছিলাম তখনও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সেটা হলো নিজের ঘরবাড়ি পরিস্কার করে আবর্জনা প্রতিবেশীর আঙিনায় নিক্ষেপ করা। আর প্রতিবেশী যদি নিজের চেয়ে ধনী হয় তবে আবর্জনা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসা। ব্যক্তিমালিকানা ওই কাজটাই বেশ পরিচ্ছন্নভাবে সম্পন্ন করছে; নিজেকে সুশ্রী করে বর্জ্যগুলো ফেলছে রাস্তা অথবা নদীতে।
এ ধরনের উন্নতির পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এবং নিজেদের দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করেন, তাদের জন্য তাই একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উন্নতির এই ধ্বংসাত্মক ধারার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো; এবং উন্নতি যাতে সামাজিক হয়, সমষ্টির স্বার্থে লাগে; ব্যক্তির মুক্তি যাতে সমষ্টির শত্রুতার পরিবর্তে সহযোগিতা লাভ করে, সেটা নিশ্চিত করা।এ কথা কিছুতেই ভুললে চলবে না যে, মানুষের মনুষ্যত্ব বিকশিত হয় সামাজিকতা ও মননশীলতার একত্র অনুশীলনে। সেটা না ঘটলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; বন্যপ্রাণীতে পরিণত হয়। আমাদের এই জনপদ জঙ্গলে পরিণত হোক- এটা নিশ্চয়ই আমরা চাইব না। সামাজিকতা ও মননশীলতা বৃদ্ধির প্রধান উপায় হচ্ছে সাংস্কৃতিক কাজকে জোরদার করা। পাড়া-মহল্লায় গ্রন্থাগার ও পাঠাগার চাই। দরকার খেলার মাঠ, নাটক, বিতর্ক, গান, নৃত্য, পত্রিকা প্রকাশ, প্রদর্শনীসহ বহু ধরনের আয়োজন। সেই সঙ্গে আবশ্যক সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং টেলিভিশনে অবাধ আলোচনা। বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো বৈষয়িক উন্নতি যত বাড়ছে; ব্যক্তির সামাজিকতা ও মননশীলতার জগৎটা ততই সংকুচিত হয়ে আসছে। ছোট হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। ব্যাপারটা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।
এটা মোটেই অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশে এখন এক ধরনের বন্ধ্যত্ব বিরাজ করছে, যেটি মূলত অর্থনৈতিক এবং যার প্রভাব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিলক্ষণ পড়েছে। বন্ধ্যত্ব আগেও ছিল। কিন্তু এত সংগ্রামের এবং তথাকথিত উন্নয়নের পরেও আমরা বন্ধ্যত্বের প্রকোপ থেকে মুক্তি পাব না; বরং তার বিস্তার দেখে হতাশাগ্রস্ত হবো- এটা মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু ঠিক সেটাই ঘটেছে। এই বন্ধ্যত্বের কারণ কী? কারণ নিশ্চয় একাধিক। কিন্তু প্রধান কারণ একটিই- দেশপ্রেমের অভাব।
এটা কোনো তত্ত্বকথা নয়, বাস্তবিক সত্য। দেশপ্রেম অর্থ হলো দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা। যে ভালোবাসা মানুষকে মানুষ রাখে, তার মনুষ্যত্বকে বিকশিত করে তোলে এবং সেই সঙ্গে সম্মিলিত উদ্যোগে ব্রতী করে। একা কেউই কিছু সৃষ্টি করতে পারে না; অন্যের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রয়োজন। এই সহযোগিতা ও সমর্থন লাভের সবচেয়ে সুন্দর, সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে দেশপ্রেম। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি; সম্ভব হয় পরস্পরকে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করে তোলা; সর্বোপরি একটি সমষ্টিগত স্বপ্নের লালন ও পালনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া যায়। সমস্যাটা হলো, এই দেশপ্রেম আগে যতটা ছিল এখন ততটা নেই।
আগে আমরা জানতাম শত্রু হচ্ছে বিদেশি; সেই শত্রু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখে আমাদেরকে শোষণ করছে। ওই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি; আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম শক্তিশালী হয়েছে। এখন রাষ্ট্রক্ষমতা দেশি মানুষদের হাতে। কিন্তু ক্ষমতা যাদের হাতে তারা দেশপ্রেমের কোনো দৃষ্টান্ত তো তুলে ধরেনই না, উপরন্তু জনগণকে শোষণ করার কাজ আগের শাসকদের মতোই অব্যাহত রেখেছেন। জনগণের তারা আর যা-ই হোন; মিত্র নন। যেহেতু এরা দেশীয় এবং নিজেদের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে জনগণকে বিভক্ত করতে অত্যুৎসাহী ও সক্ষম, তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা জমে ওঠে না। আবার লড়াইয়ের পেছনে যে দেশপ্রেম ছিল, তাও আর বিকশিত হয় না। অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের যে আদর্শ দেশের শাসকরা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন, তার প্রভাবে সাধারণ মানুষও দেশের কথা না ভেবে শুধুই নিজের স্বার্থের কথা ভাবতে চান। উভয় কারণেই সমষ্টিগত মুক্তির যে স্বপ্ন অতীতে আমাদেরকে পরিচালিত করত এবং কঠিন দুঃসময়েও আশাবাদী করে রেখেছিল, সে স্বপ্নটি এখন আর কার্যকর নেই। বস্তুত সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে এবং প্রায় প্রতিটি মানুষের জন্যই একটি দুঃস্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশপ্রেম হারিয়ে আমরা ভীষণভাবে আত্মপ্রেমিক হয়ে পড়েছি।
দেশে জ্ঞানী-গুণী আর দক্ষ লোকের কোনো অভাব নেই। আমাদের লোকেরা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশপ্রেমের অভাবের দরুন জ্ঞান, গুণ ও দক্ষতাকে সৃষ্টিশীলতার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বন্ধ্যত্বের আসল কারণটা রয়েছে এখানেই।
আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো কৃষিকে অবহেলা করা। আমাদের স্বাভাবিক নির্ভরতা হচ্ছে কৃষির ওপর। তাকে উপক্ষো করে যে আমরা এক পা’ও এগোতে পারব না- তার প্রমাণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর দেশে এখন যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে তার মধ্যে পাওয়া যাবে। কৃষিকে অবজ্ঞা করার ঘটনা শুধু যে বাংলাদেশে ঘটেছে, তা নয়। এটি বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি অংশ বটে, যে পুঁজিবাদ কৃষিকে ব্যবহার করে ঠিকই, কিন্তু উৎসাহী থাকে বৃহৎ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। আমরাও ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে রয়েছি।
অন্যদিকে আরেক ঘটনা ঘটে চলেছে। সেটা হলো ঋণবৃদ্ধি। বাংলাদেশ বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ করেছে, এটা আমরা জানি। কিন্তু এখন যেটা করছে তা হলো দেশি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ। সরকারি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেয়ে অনুৎপাদনশীল সরকারি খাতগুলোতেই খরচা বাড়ছে। প্রয়োজনে সরকার ঋণ গ্রহণ করবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তা করা দরকার ব্যাংক থেকে নয়; দেশবাসীর কাছ থেকে। এ জন্য নানা ধরনের বন্ড বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বলা বাহুল্য, এ ক্ষেত্রেও অভাব যেটির সেটি অন্যকিছু নয়, দেশপ্রেমেরই।
দেশপ্রেমের সমস্যাটা দূর করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন দরকার। তেমন আন্দোলন, যা এক দল বা গোষ্ঠীকে সরিয়ে অন্য দল বা গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসাবে না; রাষ্ট্রের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। এটিরই আজ অভাব এবং এই অভাবের জন্যই সর্বত্র এত হতাশা। যারা দেশপ্রেমিক তাদের প্রথম কর্তব্য হলো এই রাজনৈতিক আন্দোলনকে গভীরতা ও ব্যাপকতা দেওয়া। নইলে সংকট থেকে আমরা কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারব না।
ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ